বিশেষ প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের স্বৈরশাসনামলে ফুলেফেঁপে ওঠা সুবিধাভোগী লুবানা ইয়াসমিন শম্পা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বহাল তবিয়তে নিজের রামরাজত্ব কায়েম করে রেখেছেন। একসময় নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের একান্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে ক্ষমতার দাপট দেখানো এই নারী নেত্রী এখন রাতারাতি খোলস পাল্টে বর্তমান সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লুটছেন। সিলেট উইমেন্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি পদটি দখল করে তিনি গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা না করে নিজস্ব সিন্ডিকেট ও একক আধিপত্য চালাচ্ছেন।
লুবানা ইয়াসমিন শম্পা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ. কে. আব্দুল মোমেন এবং সংসদ সদস্য শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। সেই প্রভাব খাটিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দফতর থেকে তিনি কাড়িকাড়ি অর্থ ও অনৈতিক সুবিধা আদায় করেছেন। তার দাপটের কাছে তৎকালীন সিলেট উইমেন্স চেম্বারের সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেত্রী স্বর্ণলতা রায়কেও হার মানতে হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ও তার দোসররা পালিয়ে যাওয়ার পর তিনি চতুরতার সাথে ভোল পাল্টে ফেলেন। নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে তিনি বর্তমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং পরবর্তীতে আরেক মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলয়ে যোগ দিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছেন বলে সুত্র জানায়। ঢাকায় গেলে তিনি প্রভাবশালী এক সংসদ সদস্যের সাথে সার্বক্ষণিক থাকেন এবং সরকারি গাড়ি নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেন।
উইমেন্স চেম্বারের সভাপতি পরিচয়ে তিনি মেলার অনুমতির নামে ব্যাপক বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। বিয়ানীবাজার উপজেলায় মেলার অনুমতি নিয়ে তা ২৫ লক্ষ টাকায় এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। অথচ চেম্বার নেতৃবৃন্দকে তিনি জানান মেলাটি বিক্রি হয়েছে মাত্র ৮ লক্ষ টাকায়। বাণিজ্যমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ এক মেলা ব্যবসায়ী ও উপজেলা কর্মকর্তাকে মাঠের অনুমতি দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। ২৩ ও ২৬ আগস্ট ডিসি অফিসে বাণিজ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রী মুক্তাদিরের নির্দেশ রয়েছে বলে মেলার অনুমতির জন্য প্রভাব খাটান। গত ২৯ আগস্ট উইমেন্স চেম্বার অফিসে বসে ছাত্রদল ও যুবদলের নামধারী দুই ব্যক্তির সাথে শাহী ঈদগাহ মাঠে ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় মেলা আয়োজনের গোপন চুক্তি করেন।
সিলেট উইমেন্স চেম্বারকে তিনি নিজের পকেট সংগঠনে পরিণত করেছেন। সাধারণ নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের নামে আসা সরকারি-বেসরকারি সুযোগ-সুবিধা তিনি ও তার সিন্ডিকেট কুক্ষিগত করে রেখেছে। কেউ এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাকে নানাভাবে হয়রানি এবং সদস্যপদ বাতিলের হুমকি দিয়ে কোণঠাসা করে রাখা হয়। এছাড়া, চেম্বারের সদস্য হওয়ার জন্য তিনি একটি প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করেন। কিন্তু ২০২৫ সালে বিএনপি নেতাদের আশীর্বাদে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস টাউন হলে অনুষ্ঠিত মেলায় ‘এমএস মমো ফ্যাশন হাউজ অ্যান্ড হ্যান্ডিক্র্যাফট’ নামের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠান দিয়ে বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণ করে প্রতারণার আশ্রয় নেন।
লুবানা ও তার স্বামী মামুন মিলে সিটি কর্পোরেশনের টেন্ডার ভাগিয়ে নেওয়ার এক ভয়ংকর সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। স্বৈরাচার আমলে তারা পুরোদমে আওয়ামী লীগ সেজে মন্ত্রী-এমপিদের দিয়ে বিভিন্ন সরকারি কাজ বাগিয়ে নিতেন। আর বর্তমান সময়ে স্বামী-স্ত্রী মিলে মন্ত্রী, এমপি ও বিএনপি নেতাদের নাম ভাঙিয়ে সিটি কর্পোরেশনের বড় বড় কাজ হাতিয়ে নিচ্ছেন এবং অনায়াসে দুর্নীতি করে চলেছেন বলে একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই “সুবিধাবাদী গিরগিটি”-কে নিয়ে এখন তীব্র সমালোচনা চলছে। বিগত ১৫ বছর যারা রাজপথে রক্ত দিয়েছেন, তাদের চেয়ে এই সুবিধাভোগীদের দাপটই এখন বেশি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ বিএনপির ত্যাগী নেত্রীরা।
তবে এসব গুরুতর অভিযোগ ও অনিয়মের বিষয়ে লুবানা ইয়াসমিন শম্পার বক্তব্য জানার জন্য গণমাধ্যমকর্মীরা তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সেটি বন্ধ থাকায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।